সংবাদ শিরোনাম

খেজুরগুড়ের নামে ‘বিষের বাণিজ্য’: শীতের বাজারে ভেজালের ভয়াল চিত্র



# কলামিষ্ট এস এম আজাদ রহমান


বাংলার শীত মানেই খেজুরগাছ, ভোরের কুয়াশা আর টগবগে মাটির হাঁড়িতে জমা হওয়া রস। সেই রস থেকেই তৈরি হতো খাঁটি খেজুরগুড়—যা আমাদের স্বাদ, ঐতিহ্য ও স্মৃতির অংশ। কিন্তু আজ এই খেজুরগুড়ের বাজারেই চলছে ভয়াবহ ভেজাল বাণিজ্য। প্রায় প্রতিদিনই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা যায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে টিনভর্তি নকল গুড় ধ্বংসের দৃশ্য।

এত গুড় এলো কোথা থেকে?

দেশে খেজুরগাছের সংখ্যা কমছে, রস উৎপাদনও আগের মতো নেই। অথচ বাজারে বিক্রি হচ্ছে অসংখ্য টন ‘খেজুরগুড়’। উত্তরটি স্পষ্ট—একটি সংগঠিত চক্র শিল্প রাসায়নিক দিয়ে নকল গুড় তৈরি করছে।

সবচেয়ে ক্ষতিকর রাসায়নিক হলো সোডিয়াম হাইড্রোসালফাইট, বাজারে ‘হাইড্রোজ’ নামে পরিচিত। এটি সাধারণত বস্ত্রশিল্পে কাপড়ের রঙ স্থায়ী করতে ব্যবহৃত হয়। খাদ্যে এর ব্যবহার সরাসরি বিষ প্রয়োগের সমান।

একটি গবেষণায় পাওয়া গেছে—হাইড্রোজ-মিশ্রিত গুড় কিডনি ও লিভারের মারাত্মক ক্ষতি করে, রক্তে ইউরিয়া–ক্রিয়েটিনিন বাড়িয়ে দেয় এবং হাড়ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ায়। 

এছাড়া ভেজাল গুড়ে ব্যবহার করা হয় কাপড়ের রঙ, ফরমালিন, চুন, আটা ও গ্যাস পাউডার—যার অনেকগুলোই ক্যানসার ও দীর্ঘমেয়াদি রোগের কারণ।


কেন এই নীরব বিষমিশ্রণ চলছে?

অতিরিক্ত লাভের লোভ: খাঁটি গুড় তৈরি কষ্টসাধ্য, সময় লাগে; রাসায়নিক দিয়ে গুড় বানাতে সময় ও খরচ—দুটিই কম। দুর্বল নজরদারি: অভিযানে কিছু ড্রাম ধ্বংস হলেও বড় ভেজাল কারখানা শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ যথেষ্ট নেই। ভোক্তার অজ্ঞতা: আকর্ষণীয় মোড়ক বা অনলাইন বিজ্ঞাপন দেখে শহরের ক্রেতারা সহজেই প্রতারিত হন।


শীতকাল—ভেজালের ছড়াছড়ি

শীত এলেই বাড়িতে বাড়িতে পিঠা-পুলি তৈরি হয়, স্কুল–কলেজে পিঠা উৎসব, জেলা–উপজেলায় পিঠা মেলা। এই চাহিদায় ভেজালকারীরা সবচেয়ে বেশি সক্রিয় হয়ে ওঠে। ফলে অজান্তেই হাজারো পরিবার বিষাক্ত গুড় ব্যবহার করছে।


সমাধান কী?

১. কঠোর নীতিমালা ও শাস্তি

গুড় উৎপাদন ও বাজারজাতকরণে বাধ্যতামূলক মান বজায় রাখতে হবে। বিএসটিআই-এর নজরদারি বাড়াতে হবে। ভেজালকারীদের জন্য জরিমানার বদলে দীর্ঘমেয়াদি কঠোর শাস্তি প্রয়োজন।

২. প্রযুক্তির ব্যবহার

বড় উৎপাদকদের জন্য প্যাকেটে QR কোড বা ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালু করা উচিত—যাতে ক্রেতা স্ক্যান করেই জানতে পারেন উৎপাদনস্থান ও তারিখ। বাজার পরিদর্শকদের জন্য দ্রুত পরীক্ষার কিট সরবরাহ করাও জরুরি।

৩. সমবায় গঠন ও সরাসরি বাজার সংযোগ

প্রকৃত গাছি ও কৃষকদের সমবায়ে সংগঠিত করে শহরের ক্রেতার সঙ্গে সরাসরি সংযোগ তৈরি করতে হবে। এতে ভেজালচক্রের প্রভাব কমবে।

৪. ভোক্তা সচেতনতা

মিডিয়ায় খাঁটি ও ভেজাল গুড় চেনার উপায় নিয়ে ব্যাপক প্রচারণা প্রয়োজন। প্রতিটি ভোক্তাকে সচেতন হতে হবে।


ঐতিহ্য রক্ষায় জাতীয় উদ্যোগ জরুরি

খেজুরগুড় শুধু খাদ্য নয়—এটি আমাদের গ্রামবাংলার সংস্কৃতি, উৎসব ও স্মৃতির অংশ। এই ঐতিহ্যকে ভেজালের ভয়াবহতা থেকে রক্ষা করা সরকারের পাশাপাশি আমাদের সবার দায়িত্ব। প্রতিটি ক্রয় সিদ্ধান্ত, প্রতিটি সচেতনতা—ভেজালকারীদের বিরুদ্ধে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে। সুস্থ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এখনই সময়—বিষমুক্ত, খাঁটি গুড়ের পক্ষে দাঁড়ানোর।

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন